১৯৭১ সালের ২৮ জুন, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়া শহরে জন্মগ্রহণ করেন ইলন রিভ মাস্ক। যিনি আজ বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী প্রযুক্তি উদ্যোক্তা।
ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত কৌতূহলী এবং মেধাবী। মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি প্রথম কম্পিউটার কিনে প্রোগ্রামিং শেখেন।
তৎকালীন সময়ে সেই দক্ষতা তাকে ভবিষ্যতের প্রযুক্তি অভিযানে নিয়ে যায়। তার শৈশবকাল কাটে বই, গণিত ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মধ্যে।
তখন থেকেই তিনি স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন এমন একটি বিশ্ব যেখানে প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করে দেবে।

ইলন মাস্কের শিক্ষাজীবন শুরু হয় দক্ষিণ আফ্রিকার স্কুলে, পরে তিনি ভর্তি হন কুইন্স ইউনিভার্সিটিতে।
সেখান থেকে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তরিত হয়ে অর্থনীতি ও পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
আরও পড়ুন: ইলন মাস্কের সাতটি প্রধান উদ্যোগ এবং ব্যবসায়িক প্রভাব
বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোতে তিনি দেখেছিলেন যে, বড় স্বপ্ন পূরণের জন্য শুধু শাস্ত্রপড়ার শিক্ষা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সাহস, উদ্ভাবন এবং বাস্তব জীবনে পদক্ষেপ নেয়ার দৃঢ়তা।
শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার পর ইলন মাস্ক প্রথম উদ্যোগ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন জিপ ২ (Zip2)। একটি সফটওয়্যার কোম্পানি যা স্থানীয় ব্যবসায়িক তথ্য অনলাইনে সরবরাহ করত।
১৯৯৯ সালে এটি কম্প্যাক (Compaq) ৩০৭ মিলিয়ন ডলারে কিনে নেয়। জিপ ২-এর সাফল্যের পর তিনি এক্স ডট কম (X.com) প্রতিষ্ঠা করেন।

যা পরবর্তীতে পেপাল (PayPal) নামে পরিচিত হয়। ২০০২ সালে ই বে (eBay ) ১.৫ বিলিয়ন ডলারে কিনে নেয়।
ইলন মাস্ক বৈদ্যুতিক গাড়ি প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিপ্লব আনেন ২০০৪ সালে টেসলা মটরস (Tesla Motors) -এ বিনিয়োগ ও পরবর্তীতে কোম্পানির সিইও হয়ে।
টেসলা শুধু গাড়ি নয়, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির সম্ভাবনার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
আরও পড়ুন: ইলন মাস্কের গ্রোক এআই যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অনুমোদন পেল
একই সময়ে ২০০২ সালে তিনি স্পেস এক্স (SpaceX) প্রতিষ্ঠা করেন। যার মাধ্যমে মানুষের মহাকাশযাত্রা এবং অনবরত মহাকাশ আবিষ্কারের সুযোগ বৃদ্ধি পায়।
স্পেস এক্স প্রথম বেসরকারি কোম্পানি হিসেবে ফ্যালকন ১ (Falcon 1) রকেট উৎক্ষেপণ করে। পরবর্তীতে মানুষকে মহাকাশে পাঠানোর স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেয়।
ইলন মাস্ক তার প্রযুক্তি উদ্যোগের বাইরে আরও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান চালু করেন। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন সোলার (SolarCity)। যা সৌরশক্তি ব্যবহারে মানুষের জীবনকে সহজ ও পরিবেশবান্ধব করার কাজ করে।
দ্য বোরিং কোম্পানি (The Boring Company)। যা শহরের নিচ দিয়ে দ্রুত পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে।
২০১৫ সালে মাস্ক স্যাম অল্টম্যানের সঙ্গে ওপেনএআই প্রতিষ্ঠা করেন। যদিও ২০১৮ সালে বোর্ড থেকে সরে যান।

২০২২ সালে তিনি টুইটার (Twitter) (পরবর্তীতে X) কিনে নেন। প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন পরিবর্তন আনার মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়ার জগতে প্রভাব ফেলে।
ইলন মাস্ক তিনবার বিয়ে করেছেন। ১০ সন্তানের জনক। ব্যক্তিগত জীবনে বিভিন্ন বিতর্কিত মন্তব্য এবং কর্মকাণ্ডের কারণে তিনি আলোচিত হলেও, তার উদ্যোক্তা ও দূরদর্শী চরিত্রকে কখনো অবমূল্যায়ন করা যায় না।
মার্কিন সাময়িকী ফোর্বসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বর ২০২৫ টেসলার শেয়ারের দাম ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এর ফলে কোম্পানির প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কের সম্পদে বড় ধরনের উত্থান ঘটেছে। বিনিয়োগকারীরা এখন আশাবাদী, মাস্ক নতুন উদ্যমে টেসলাকে এগিয়ে নেবেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ১২ সেপ্টেম্বর মাস্ক নিজেই টেসলার প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের শেয়ার কিনেছেন।
এর মাত্র এক সপ্তাহ আগে টেসলার বোর্ড তাকে প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বেতন প্যাকেজ প্রস্তাব দেয়।

ওই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে মাস্ক অতিরিক্ত প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলারের শেয়ার পেতে পারেন (ট্যাক্স ও অন্যান্য খরচ বাদে)।
এ খবর প্রকাশিত হওয়ার পর, টেসলার এআই ও রোবটিক্স পরিকল্পনা ঘিরে নতুন আস্থা তৈরি হয়। যা শেয়ারের দাম বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখে।
বর্তমানে ইলন মাস্ক টেসলা ও স্পেসএক্সের সিইও।
এক্সের (পূর্বে টুইটার) চেয়ারম্যান ও চিফ টেকনোলজি অফিসার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান এক্সএআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা।
২০২৫ সালের মার্চে এক্সএআই এক্স অধিগ্রহণ করে। যার মূল্যায়ন ছিল ৪৫ বিলিয়ন ডলার (ঋণসহ)।

এর আগে, ২০২২ সালে মাস্ক ৪৪ বিলিয়ন ডলারে টুইটার কিনেছিলেন। বর্তমানে টেসলায় তার প্রায় ১২ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। যার একটি অংশ ঋণের জামানত হিসেবে রাখা আছে।
মাস্ক প্রথমবার বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হন ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে। ২০২২ সালের প্রায় পুরো সময় তিনি শীর্ষস্থান ধরে রাখলেও, ডিসেম্বরে পিছিয়ে যান।
আবার ২০২৩ সালের জুনে তিনি শীর্ষে ফেরেন এবং পুরো বছর সেই অবস্থানে ছিলেন।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আবার দ্বিতীয় স্থানে নেমে গেলেও, মে মাসে এক্সএআইয়ের জন্য ৬ বিলিয়ন ডলার তোলার পর ফের শীর্ষে ফিরে আসেন।

বর্তমানে তার দাবি, এক্সএআইয়ের মূল্য ৮০ বিলিয়ন ডলার, আর স্পেসএক্সের মূল্য আগস্টে প্রাইভেট টেন্ডারে ৪০০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
ইলন মাস্ক শুধুমাত্র একজন উদ্যোক্তা নন; তিনি একজন দূরদর্শী চিন্তাবিদ, যিনি প্রযুক্তি, পরিবহন, মহাকাশ, শক্তি এবং সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে পৃথিবীতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনছেন।
তার জীবন দেখায় যে, সাহস, উদ্ভাবন, অধ্যবসায় এবং বড় স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্রতিজ্ঞা মিললে, এক ব্যক্তি সত্যিই পৃথিবীর চেহারা বদলে দিতে পারে।









